নিশীথে_স্বপনে_জোছনায়
পর্ব-৩
অর্নব শোরুমে গিয়ে একটার পর একটা শাড়ি দেখছে। কোনেটাই তার তেমন পছন্দ হচ্ছে না। সুজানা দেখতে সুন্দরী, তবে কোন শাড়িটা মানাবে ঠিক বলা যায় না। মেকআপ করে চোখা বানিয়ে রাখে চেহারাটা। শেষ পর্যন্ত একটা কাজ করা জর্জেটের শাড়ি কিনে নিল। রঙ সবুজ। দাম একুশ হাজার। বিল দেয়ার সময় অর্নবের মনে হলো কেউ ওর কলিজা কেটে রেখে দিচ্ছে। কতদিন ধরে জমিয়েছিল টাকাগুলো!
শাড়ি কিনে বের হয়েই মনে হলো, সে শাড়ি কিনল কেন? সুজানা কি শাড়ি পরে? কখনোই দেখেনি। সবসময় জিন্স-টিশার্ট, নয়তো স্কার্ট বা ডিজাইনার ড্রেস পরেছে। শুধু অভিনয়ের প্রয়োজনে শাড়ি পরে ও। তাও হাঁপিয়ে যায় অল্প সময়ে। দুপাশ থেকে দুজনকে শাড়ি ধরে রাখতে হয়। আর সে যে শাড়িটা কিনেছে সেটা সুজানা জীবনেও পরতে পারবে না। খামাখা শাড়ি কেন কিনল সেটাই এখন অর্নবের মাথায় ঢুকছে না। মাথায় প্রাচীকে দেয়া শাড়িটা আসার পর থেকেই কাল হয়েছ।
অর্নব শাড়িটা প্যাকেট থেকে বের করে দেখল ক্যাটক্যাটে সবুজ রঙ। ভেতরে রকমারি আলোতে ভালো লাগছিলো রঙটা। বাইরে এসে শ্যাওলা কালার মনে হচ্ছে। এই জিনিস কেউ নিজে পছন্দ করে গার্লফ্রেন্ডকে দেয়! হাউ স্টুপিড য়্যু আর অর্নব!
নিজেকে আরও দু'চারটা গাল দিয়ে ফুটপাথে বসে পড়ল অর্নব। আজ সুজানার বার্থডে। একটা হোটেলে পার্টি রেখেছে সুজানা। অর্নব ছাড়াও তার কিছু বন্ধুবান্ধব আসবে। সে যে গিফট দেবে সেটা নিশ্চয়ই সবাইকে দেখাবে ও। এবার মনে হচ্ছে ইজ্জত সম্মানের ফালুদা হবে।
.
অনিতা বাবুকে গোসল করিয়ে নতুন জামা পরিয়েছে। আজ তারা নানুর বাড়িতে যাবে। বাবুর নাম রাখা হয়েছে অদৃজা। নাম রেখেছে বাবুর বাবা। সারাদিন অদৃ অদৃ ডেকে মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। ওদের বিকেলে বের হওয়ার কথা। সব গোছগাছ করে নেবে, এর মাঝে নাদিম কোথায় চলে গেছে! আশ্চর্য লোক! ওকে ছাড়া অনিতা ঠিকভাবে কিছু গোছাতে পারে না। সবসময় মনে হয় কী একটা যেন রয়ে গেছে বাকি। জ্যেষ্ঠ মাসের শেষাশেষি এখন। বাইরে তপ্ত রোদ সকাল থেকে মাথার ওপর। এর মধ্যে কোথায় গিয়ে বসে আছে? এ তো বাইরে আড্ডা দেয়ার লোক নয়। না বলে যায়ও না কোথাও। অনিতার ভাবতে ভালো লাগছে না। সে সামনে যা পাচ্ছে ব্যাগে ভরে নিচ্ছে।
অনিতার মা রোকসানা চেয়েছিলেন ডেলিভারির সময় অনিতা তার কাছে গিয়ে থাকুক। কিন্তু নাদিম যেতে দেয়নি। সে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে থাকতে পারে না, আবার অনিতাকে এ সময় চোখের আড়াল করতে চায় না। অনিতার শাশুড়ি ওর ভালোই খেয়াল রাখে। আর নাদিমের ওপর চোখ বুজে বিশ্বাস করা যায়। তাই রোকসানা আর কথা বাড়ায়নি। তবে আগামীকাল থেকে নাদিমের ছুটি শেষ। তাই এখন নিজের কাছে মেয়ে আর নাতনীকে রাখতে চাইছেন।
অনিতা বারান্দায় মেলা কাপড়গুলো আনতে গিয়ে নাদিমকে বাড়িতে ঢুকতে দেখল। সকালবেলা পাঞ্জাবি পরে বাবু সেজে কোথায় গিয়েছিল? অনিতা ইদানিং একটু দেরিতে ওঠে। অদৃকে নিয়ে রাত জাগতে হয়। সকালে সে উঠে নাদিমকে পায়নি। অনিতা কাপড়গুলো নিয়ে ঘরে ঢুকলো। অদৃ হাত পা ছুড়ে খেলছে। অদৃর মুখটা একদম নাদিমের মতো হয়েছে। চোখদুটো মাঝারি, নাকের হাড়টা উপরের দিকে ঈষৎ বাঁকা, চওড়া ঠোঁট আর খানিক লম্বাটে মুখ। গায়ের রঙও নাদিমের মতো ফরসা। অনিতা শ্যামলা। ওর কিছুই পায়নি অদৃ। অনিতার বিষয়টা ভাবতে কেন যেন ভালো লাগে। মেয়েটা বাবার মতো হয়েছে। বাবার মতো যারা হয় তারা নাকি ভাগ্যবতী হয়। কতটা সত্যি সেটা? সে নিজেও তো তার বাবার মতো দেখতে।
.
শাড়িটা দেখে অনিতার চোখে পানি চলে এল। সে প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল নাদিম যেন তার মনের ভাব বুঝে না ফেলে। ধাতস্থ হয়ে খানিক রাগের ভান করে বলল, "এটা এখন কিনেছ কেন? এত খরচের মধ্যে আবার বাড়তি খরচের কী দরকার ছিল?"
নাদিম হাসলো। কিছু বলল না। অনিতা খুশি হয়েছে, তাতেই সে খুশি।
অনিতা কথার জবাব না পেয়ে দাঁড়িয়ে বলল, "এখন শাড়ি পরতে পারব? কত মোটা হয়েছি দেখেছ? তার ওপর চেহারাও নষ্ট হয়ে গেছে এত এত ব্রন, চোখের নিচে কালি, চুলগুলো রুক্ষ! আয়নার সামনে দাঁড়ালে কান্না পায়।"
নাদিম হেসে অনিতাকে টেনে আয়নার কাছে নিয়ে গেল। অনিতার গালদুটো টেনে দিয়ে ওর কাঁধে নিজের থুঁতনি রেখে ওর মাথার সাথে মাথা ঠেকিয়ে বলল, "দেখো, কতো সুন্দর আমার বউ। শুধু শুধু খারাপ বলো কেন? তুমি যেমন, তেমনই ভালো। আমি সেভাবেই তোমাকে ভালোবাসি। আজ শাড়িটা পরে বাবার বাড়িতে যাবে, কেমন?"
"হুম।" চোখ নিচু করে জবাব দিল অনিতা। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আমারও তোমাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে নাদিম। তোমার মতো করেই। অনেক ইচ্ছে করে। কিন্তু পারি না। মনের কিছু অংশ যে ব্যক্তির ইচ্ছে অনুযায়ী চলে না। তোমার জন্য আমার মায়া হয়, তবে ভালোবাসা যে হয়ে ওঠে না৷ তোমাকে ঠকাতে চাই না আমি। চলে যেতে চাই। তুমি আমাকে এত তীব্র ভালোবাসা দিয়ে কেন বেঁধে রেখেছ বলতে পারো?"
.
স্নিগ্ধা দ্রুত বাসায় ফিরল। আজ অনিতা বাবুকে নিয়ে চলে যাবে। অদৃজাকে দেখা হবে না আর কতদিন কে জানে! বাবুটার জন্য ক'দিনেই এত মায়া পড়ে গেছে! ইচ্ছে করে বুকে জড়িয়ে রাখতে সারাক্ষণ।
বেল বাজিয়ে একটু অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল স্নিগ্ধা। তার আশা, বড় চাচী সুফিয়া যেন দরজা না খোলেন। তার বড় চাচী তাকে খুব একটা পছন্দ করেন না। সেটা তার মা বাবার অমন সম্পর্কের কারনে, নাকি তার বেপরোয়া স্বভাবের জন্য, সেটা জানা নেই।
দরজা খুলে দিলেন সুফিয়া। ওকে দেখে খুশি হলেন না বোঝাই গেল। স্নিগ্ধাও কিছু বলল না। পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। নাদিম ঘরে ছিল। স্নিগ্ধাকে দেখে বলল, "যাবি নাকি আমাদের সাথে?"
"আমি গিয়ে কী করব?"
"বেড়াবি। তুই তো বলিস কোথাও যেতে ইচ্ছে করে। তো চল না। নিভৃতও আছে ওবাড়িতে। ভালো লাগবে।"
"উহু, কাজ আছে। তোমরাই যাও। আর ঝামেলা মাথায় নিয়ে কারো বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া যায় না। আমি এই ঢাকার পরিবেশটা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চাই।"
"তো যা। কে আটকে রেখেছে?"
"দেখছ না পরীক্ষা মাথার ওপর।"
"কই তোর মাথায় পরীক্ষা দেখি না।"
স্নিগ্ধা হাসলো। নাদিম ভাই মাঝেমধ্যে হালকা রসিকতা করেন। তার ছিমছাম চরিত্রের সাথে কেমন একটা মানিয়ে যায়। ছোট ছোট কথাই মজা লাগে খুব।
"নেক্সট মান্থে পরীক্ষা। শেষ হোক, তারপর যতদূর চোখ যায়, চলে যাব।"
"একা যাওয়ার চেয়ে বন্ধুবান্ধব নিয়ে যাস।"
"তাও হয়। দেখি।"
নাদিম কী যেন বলতে চাচ্ছিলো, এর মাঝে অনিতা গোসল করে বের হলো৷ পরনে আকাশের মতো হালকা নীল শাড়ি, গায়ের রঙের সাথে কী সুন্দর মানিয়ে গেছে! চুল দিয়ে পানি পড়ছে। গলার কাছে চুল লেপ্টে আছে কিছু। কী সুন্দর লাগছে তাকে! স্নিগ্ধা মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইল। অনিতা ওকে দেখে বলল, "কখন এসেছ? আমাদের সাথে খেয়ে যেও। তোমাদের বুয়া আসেনি। বেশি করে রেঁধেছি। এখন খেয়ে তিনজনের জন্য রাতের খাবার নিয়ে যাবে।"
"তাহলে এখনকার খাবারটাও দিয়ে দিও ভাবী।"
"কেন, আমাদের সাথে খেতে কী সমস্যা?"
"পড়া আছে। পড়তে পড়তে খাব।"
অনিতা কথা বাড়ালো না। সে জানে, স্নিগ্ধা খেতে চায় না কারন তার শাশুড়ি স্নিগ্ধাকে দেখতে পারেন না। এমন দুঃখী একটা মেয়েকে অপছন্দ করার কী কারন? এমনিতে মহিলা যথেষ্ট ভালো, তবে এই একটা জিনিস অনিতার ভালো লাগে না। স্নিগ্ধার জন্য কিছু করতে গেলেও ওনার আপত্তি। সে শাশুড়িকে না বলে বেশি রান্না করেছে। এখন খাবার দিতে গেলে কী বলবেন কে জানে! স্নিগ্ধার সামনে না বললেই হয়।
.
স্নিগ্ধা পড়ার অজুহাত দেখালেও তার সত্যিই অনেক পড়াশুনা করতে হবে। পরীক্ষার পনেরো দিন বাকি। একসময় পড়ুয়া বলে ওর নাম ছিল। সেটা সুনাম না দুর্নাম ঠিক বলা যায় না। যারা সবদিক থেকে পারফেক্ট, তারা পড়াশুনায় ভালো হলে সেটা একটা গুণ, কিন্তু শুধু পড়াশুনায় ভালো হলে সেটা হয়তো গুণ নয়। 'জীবনে কিছু একটা করতে হয়, অন্যকিছু পারে না তাই পড়াশুনা করছে' - টাইপ ধারনা।
স্নিগ্ধা এতদিন তেমন কিছুই পড়েনি। এমবিএ করছে সে। দুনিয়ার পড়া। আজ সব নোটস জোগাড় করে নিয়ে এসেছে। বাড়িতে ঢুকে সেসব নিয়ে বসল। নিজের ক্ষেত্রে অগোছালো হলেও পড়াশুনা সে গুছিয়ে করতে পছন্দ করে। নিয়ে আসা শীটগুলো যত্ন করে আলাদা আলাদা সেট করল, কিছু জরুরি নোট আলাদা করল, সেগুলো ফাইলে সাজিয়ে রাখল। এখন শুধু পড়া শুরু করতে হবে।
সব শেষে দেখল শরীর আঠা আঠা লাগছে। ঘন্টাখানেক সময় নিয়ে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে যখন বের হলো, তখন বিকেল হয়ে গেছে। সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়েছে। রোদ মাটি থেকে বিদায় হয়ে দালানগুলোর মাথার দিকে উঠে গেছে। হাসফাস গরমটা কমে একটু শান্ত পৃথিবী।
স্নিগ্ধা খেতে বসল পাঁচটা বাজে। অনিতার হাতের রান্না ভালো। খাবার ঠান্ডা হয়ে গেলেও তৃপ্তিসহকারে অনেকটা খেয়ে ফেলল স্নিগ্ধা। হঠাৎ তার মনে হলো মা অনেকদিন রান্না করে না। আগে করত, তাও দু'বছর হয়তো হবে রান্নাঘর ত্যাগ করেছে। বুয়া না থাকলে বাইরে থেকে খাবার আনায়, তাও নিজে চুলার কাছে যায় না। স্নিগ্ধার ধারণা ছিল সেটা বাবার সাথে রাগ করে। এখন মনে হচ্ছে তার মা আসলে সংসারে আগ্রহী না একেবারেই। নিজের দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত আছে৷ রূপচর্চা করে, আগের চেয়ে মর্ডান হয়েছে এখন।
রোজ রাতে নিয়ম করে ঝগড়া করে বলে স্নিগ্ধার মনে হতো মা হয়তো সংসার টিকিয়ে রাখতে চাচ্ছে। বিষয়টা হয়তো তেমন না। কেমন, সে বিষয়ে তার আগ্রহও নেই।
স্নিগ্ধা ঠিক করল যে করেই হোক, মাকে দিয়ে রান্না করাবে আজ। খাবারগুলো সে লুকিয়ে ফেলল। ওদের খেতে বসতে বসতে বারোটা, একটা বেজে যায়। তখন তো রেস্টুরেন্ট খোলা থাকবে না। রান্না করে খেতে হবে। স্নিগ্ধা না খেয়ে আছে শুনলে তার জন্য হলেও তো রাঁধবে।
.
স্নিগ্ধার পড়তে পড়তে ঘুম আসছিলো, তবু সে জেগে রইল কষ্ট করে। তার মা এলো সাড়ে নয়টায়, বাবা দশটায়। দুজনেই খাবারের খোঁজ করল, বুয়াকে গালাগাল করল। মজার বিষয় হলো, আজ তারা নিজেরা ঝগড়া করল না। দুজনে একতাবদ্ধ হয়ে বুয়াকে বকাবকি করে গেল৷ কিন্তু কেউই রান্না করার ইচ্ছে দেখালো না। এমনকি স্নিগ্ধার কথা জিজ্ঞেসও করল না। না খেয়ে যার যার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
স্নিগ্ধা জানালা ধরে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। কান্নাকাটির দিন সে পার করে এসেছে। হাতমুখ ধুয়ে রান্নাঘর থেকে লুকিয়ে রাখা খাবার বের করে একাই খেলো। তারপর ঘুমাতে গেল। পৃথিবীতে কেউ কারো নয়, তবে অনেকের বাবা মা আছে। তার নেই, ব্যাপার না। একাই পারবে চলতে। একটা চাকরি পেলেই চলে যাবে এখান থেকে।
.
রাত প্রায় একটা। নিভৃত শুয়ে আছে। পাশের ঘর থেকে অদৃর কান্নার আওয়াজ আসছে। অনিতার গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে মাঝে মাঝে। সুখী পরিবার। নিভৃতর ঘুম আসছে না৷ তার বিছানার পাশে খোলা জানালা দিয়ে তারকারাজি দেখা যাচ্ছে। পরিষ্কার গ্রীষ্মের আকাশ। তবে কোথায় কী যেন নেই। নিজের একটা সংসার নেই। বউ নেই..একা একা কতদিন থাকা যায়! বিয়ের বয়স হচ্ছে, এমন মনে হবেই। চিন্তাগুলো বড্ড বেশি বেয়াড়া হয়ে যাচ্ছে বলে সে মন অন্যদিকে ঘোরালো।
আজ সকালে ফেরার সময় রাস্তায় এক উজবুকের সাথে দেখা। তার সাথে ধাক্কা খেয়ে দুজনের জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে একাকার। ছেলেটা ভীষণ বদমেজাজি। তার হাতে শাড়ি আর কয়েকটা গহনা ছিল। রাস্তায় পড়ে যাওয়ায় চেঁচিয়ে মাথা খারাপ করার জোগাড়। নিভৃত বহুকষ্টে সামলেছে ঘটনা, যদিও তার দোষ ছিল না। ইচ্ছে করছিলো ঘুষি দিয়ে নাক ফাটিয়ে দিতে। হাতটাকে সামলে রেখেছিল মুঠো করে। কে জানে হয়তো প্রেমিকার জন্য উপহার বলে এত রাগ হয়েছিল! এত মেজাজি ছেলের আবার প্রেমিকা! তারই হলো না কিছু। একেবারে যে হয়নি তাও না। তবে যারা ছিল তারা কেউই জীবনে বেঁধে রাখার মতো ছিল না।
.
অর্নব বাড়ি ফিরল দেড়টায়। তার দিনটা আজ খারাপই গেছে। যা ভেবেছিল, তাই হয়েছে। শাড়িটা দেখেই মুখ অন্ধকার হয়েছে সুজানার। পুরো পার্টিতে ঠিকমতো তার সাথে কথা বলেনি। কাপল ডান্সের সময় তাকে ডাকা হয়নি। অন্য এক বন্ধুর সাথে নেচেছে। "লোভী মেয়েমানুষ! শালী একটা ***" মনে মনে গাল দিল অর্নব। "সব মেয়েরাই এমন হয়। টাকা, দামী গিফট, শো অফ ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না।"
অর্নবের হুট করে মনে পড়ে গেল প্রাচীর কথা৷ প্রাচী এমন মেয়ে নয়। তার কোনো চাহিদা ছিল না সম্পর্কে। লোক দেখানেও ছিল না৷ ব্রেকাপের পর প্রথমবারের মতো অর্নবের বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠলো প্রাচীর জন্য। মেয়েটার সাথে সে অন্যায় করে ফেলল না তো? কত ভালোবাসতো তাকে! সে ও তো ভালোবাসতো। এখন কি বাসে না? সম্পর্ক চলাকালীন সময়ে সে সব পরীক্ষার আগে প্রাচীকে দেখে যেত, যাতে পরীক্ষা ভালো হয়। এক রাত ওর সাথে কথা না বললে ঘুম আসতো না। ওকে দুদিন না দেখলে অস্থির লাগতো সেসব এখন হয় না? নাকি হয়, সে সব ভুলে গেছে...
একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল একদম ছবির মতো৷ তাদের প্রেম শুরু হওয়ার পর প্রাচীর প্রথম জন্মদিনের কথা। সে সময় সে ভুলে গিয়েছিল দিনটা। সকালবেলা প্রাচী ফোন করে কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছিল, "তুমি আমাকে উইশ করলে না কেন? আমি সারারাত জেগে বসে ছিলাম তোমার ফোনের অপেক্ষায়৷"
অর্নবের কী যে রাগ লেগেছিল নিজের ওপর! সে বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। তখন হাতে টাকা নেই, মাত্র কয়েকদিন আগে নিজের টাকা দিয়ে নতুন ল্যাপটপ কিনেছে। নতুন সেমিস্টারের টাকা দিয়েছে কিছুদিন আগে, তাই বাবার কাছেও চাওয়া যাবে না। কী দেবে প্রাচীকে?
ভাবতে ভাবতে দেখা মিলল দুটো বাচ্চার। হাতে একগাদা কদম ফুল নিয়ে ঘুরছে। এক পিস পাঁচ টাকা করে বিক্রি করছে। সবগুলো নিয়ে নিল অর্নব। প্রাচীর বাসার সামনে গিয়ে ফোন করল তাকে।
গাল ফুলিয়ে এসেছিল প্রাচী। ফুলগুলো দেখে এক মুহূর্তে মন ভালো গয়ে গিয়েছিল তার। কোথায় রাগ, কোথায় কী! সেদিন সারাদিন তারা ঘুরেছিল ঢাকার আনাচে-কানাচে। হাতে সেই ফুলগুলো নিয়ে। তার পরনে সাদা চেকের শার্ট ছিল। প্রাচী একটা মেরুন রঙের জামা পরেছিল, কপালে গোল বিন্দুর মতো ছোট্ট টিপ ছিল। সেদিন বিকেলে বৃষ্টি নেমেছিল। দুজন ইচ্ছেমতো ভিজেছিল। ভিজে ভিজে একসময় রাস্তার পাশের একটা ছাউনিতে বসে প্রাচী জিজ্ঞেস করেছিল, "বিয়ের পর ভিজবে তো এভাবে? শুনেছি বিয়ে হলে নাকি ছেলেরা আনরোমান্টিক হয়ে যায়!"
অর্নবের সে কথায় সত্যি রাগ হয়েছিল। সে কি অন্য ছেলেদের মতো নাকি? প্রাচীটাও না! সে বুক ফুলিয়ে বলেছিল, "দেখো, কেমন থাকি। তখন তুমি আবার চুপসে যেও না যেন!"
কথাটা মনে হতেই মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো অর্নবের। এই তো মাত্র এক বছর আগের কথা। এতটুকু সময়ে এত পরিবর্তন হলো কী করে?
এই সময় অর্নবের খুব ইচ্ছে হলো একবার প্রাচীর সাথে কথা বলতে। সে ফোন করল প্রাচীকে। প্রাচী ধরলো না। আবার ফোন করলো, বারবার করতেই থাকলো। কেউ ধরলো না।
অর্নব জানে না, প্রাচী শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। ইদানিং তার ঘুম খুব ভালো হয়। বহুদিনের অনিদ্রা রোগ সেরে গেছে তার।
(চলবে)
সাথেই থাকুন !