­

সুখ পাখির দল(পর্ব_১)

সুখ_পাখির_দল
পর্ব_১
জ্যামে বাস আটকে আছে প্রায় আধঘন্টা। পরীক্ষা শুরুর আর মাত্র বিশ মিনিট বাকি। স্বর্ণ বাস থেকে নেমে গেল। একটু হেঁটে বাকিটা রিকশা দিয়ে চলে যাবে। নইলে পরীক্ষা অ্যাটেন্ডও করতে পারবে না।
স্বর্ণ তিন রাস্তার মোড়ে এসে দাড়াল। একটাও খালি রিকশা দেখা যাচ্ছে না। সকালটা কেমন যেন ফ্যাকাসে। বৃষ্টি হবে হবে ভাব তবে হচ্ছে না। ভ্যাপসা গরম। ঘেমে একাকার স্বর্ণ। চশমার কাচ ঘোলা হয়ে গেছে। সে চোখ থেকে চশমা খুলে রুমাল দিয়ে কাচ মুছল। তাঁর চশমার পাওয়ার মাইনাস ফোর। খালি চোখে একটু দূরের জিনিসও স্পষ্ট দেখে না। হঠাৎ সে একটা চিৎকার শুনতে পেল। অস্পষ্টভাবে দেখল বিরাট কিছু একটা তাঁর দিকে দ্রুত ছুটে আসছে। সে চশমা চোখে দেয়ার সময় পেল না। প্রচন্ড ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল দূরে। মাথায়, হাতে, পায়ে অসহ্য ব্যথা! কেউ একজন তাঁর হাত ধরে ঝাকাতে লাগল। আর কিছু মনে নেই...
.

চোখ খুলে স্বর্ণ দেখল সে একটা হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। শরীরের নানা জায়গায় ব্যান্ডেজ লাগানো। চারপাশে সারি সারি বেড। লোকজনের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। বাতাসে ঔষধ আর ফিনাইলের গন্ধ। স্বর্নর সারা শরীর ব্যথা। মাথায় যেন কেউ হাতুড়ি পেটাচ্ছে। তাঁর পাশে হালকা আকাশী রঙের শার্ট পরা একটা ছেলে করুণ মুখে বসে আছে। একদম কাছে বলে ছেলেটার মুখ সে মোটামুটি ভালোই দেখতে পাচ্ছে। স্বর্ণকে চোখ খুলতে দেখে ছেলেটা বলল, "আপনার জ্ঞান ফিরেছে?"
স্বর্ণ মনে মনে বলল "অন্ধ নাকি? দেখতেই তো পাচ্ছে।" মুখে বলল, "হুম।"
ছেলেটা একটু খুশি খুশি গলায় বলল, "ভালো লাগছে?
"না৷ শরীর ব্যথা।"
"তা তো হবেই।"
"আমাকে এখানে কে এনেছে?"
"রাস্তায় যারা ছিল তারা। হাসপাতালে এসেছিল অনেকেই। বাকিরা চলে গেছে।"
স্বর্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "এখন কয়টা বাজে?"
ছেলেটা হাতঘড়ি দেখে বলল, "পাঁচটা বিশ।"
"বিকাল?"
"হ্যাঁ।"
স্বর্ণ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, "আমার আজকে পরীক্ষা ছিল!"
"কিসের পরীক্ষা? "
"মিডটার্ম।"
ছেলেটা অবাক হয়ে হতাশ গলায় বলল, "বেঁচেছেন যে তাই বেশি। সেজন্য আপনার শুকরিয়া করা উচিত।"
স্বর্ণর মন খারাপ হল। পরীক্ষা ব্যাপারটা তার উদ্ধারকর্তা সিরিয়াসলি নিচ্ছে না। লোকটা কি জানে তাঁর কতো স্বপ্ন ছিল ডিপার্টমেন্ট ফার্স্ট হওয়ার...
ছেলেটা বলল, "এবার আপনার বাড়ির কারও ফোন নম্বর দিন। তাদের খবর দিতে হবে।"
"কেউ জানে না এখনো?"
"কী করে জানবে?"
"ওহ, তাইতো! আমার ব্যাগ...ব্যাগ কোথায়?"
"জানি না। কোথায় ছিটকে পড়েছে, কে নিয়ে গেছে ঠিক আছে কোন?"
স্বর্ণর মাথা ব্যথা বাড়ল। তার ব্যাগে একটা অনেক পুরানো ডায়েরী ছিল। সব লিখে রাখত তাতে। কয়েকটা হ্যান্ড নোট ছিল, মোবাইল ছিল, অনেকগুলো টাকাও ছিল..
ছেলেটা আবার জিজ্ঞেস করল, "বাড়ির লোকজন বোধহয় খুঁজছে আপনাকে। নম্বর দিন। আমি খবর দেই।"
স্বর্ণ তাঁর বড় মামার ফোন নম্বর বলল।
ছেলেটা ফোন করতে করতে বলল, "ভালো কথা, আপনার নাম কী?"
"স্বর্ণ।"
"স্বর্ণা?"
"উহু। স্বর্ণ।"
"ওহ!"
ছেলেটা ফোন করে ধীরে সুস্থে সব বলল। এর মধ্যে একজন নার্স এসে স্বর্ণকে দেখে গেল। কথা শেষে ছেলেটা উঠে দাড়িয়ে বলল, "আমি তাহলে আসি।"
"চলে যাবেন?"
"হ্যাঁ। আপনার বাড়ির লোক চলে আসছে। আমি আর থেকে কী করব?"
স্বর্ণ এবার ভালো করে ছেলেটাকে দেখল। ফরমাল ড্রেসআপ। ক্লিন শেইভ। দেখতে বেশ হ্যান্ডসাম। সে জিজ্ঞেস করল, "আপনি কি অফিস বাদ দিয়ে আমার কাছে বসে ছিলেন?"
"জ্বি না৷ আমারও পরীক্ষা ছিল।"
"কী পরীক্ষা?"
"বিসিএস এর ভাইভা।"
স্বর্ণ হা হয়ে তাকিয়ে রইল। বলে কী এটা!
অনেক কষ্টে বলল, "তাহলে আপনি এখানে বসে আছেন কেন?"
ছেলেটা মুচকি হাসল। বলল, "আপনি অসুস্থ তাই। একা ফেলে চলে যেতাম?"
"আর আপনার পরীক্ষা?"
"পরের বছর।"
"আর কয় বছর বিসিএস দিতে পারবেন?"
"নেক্সট ইয়ারেই লাস্ট।"
"বলেন কী! যদি না হয়?"
"না হলে নাই। এবারই প্রথম ভাইভা পর্যন্ত গিয়েছিলাম। পরের বার আর একটু ভালো হতেও পারে।"
স্বর্ণর ভীষণ কান্না পেল। কিছু বলতে ইচ্ছে করছে। অচেনা একটা মেয়ে অসুস্থ বলে কেউ এত জরুরি পরীক্ষা বাদ দেয়? এই ছেলেকে কী বলে ধন্যবাদ দেয়া যায়? সেরকম ভাষা কি আছে?
ছেলেটা দাড়ানো অবস্থায় স্বর্ণর দিকে একটু ঝুকে বলল, "সাবধানে থাকবেন। আসছি।"
ছেলেটা গা থেকে খুব মৃদু মিষ্টি একটা ঘ্রাণ আসছিল। ঘ্রাণটা নিয়ে সে চলে গেল। স্বর্ণ খেয়াল করল তাঁর বুকে ব্যথা করছে। শরীরে ব্যথার চেয়ে অনেক বেশি।
.
স্কুল থেকে ফেরার পথে একটা রাস্তা পড়ে। মোটামুটি নির্জন, সুন্দর একটা রাস্তা। দুই ধারে গাছপালা। মাঝখানে পিচঢালা পথ। মৌনি একটা কদম গাছের নিচে দাড়াল। ব্যাগ থেকে ছোট্ট মোবাইল ফোনটা বের অনিককে ফোন করল।
অনিক ঘুমিয়ে ছিল। ফোনের রিংটোনে ঘুম ভাঙল। কারেন্ট নেই। ঘেমে চুপচুপে হয়ে গেছে। উঠে সে খেয়াল করল তার পরনে কিছুই নেই। ঘুমের ঘোরে লুঙ্গিটা ফেলে দিয়েছে কখন খেয়ালও নেই। সে লুঙ্গিটা খাটের নিচ থেকে তুলে পরে নিল। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল মৌনি ফোন করেছে।
"হ্যালো জান, বলো।"
"কোথায় তুমি? কখন থেকে ফোন করছি। জানো না আমার আর কথা বলার সুযোগ হবে না?"
"সরি জান। মিটিংয়ে ছিলাম। ফোন সাইলেন্ট করা ছিল।"
"ওহ। খেয়েছ দুপুরে?"
অনিকের মনে পড়ল সে খায়নি। খিদেয় পেট চো চো করছে। বলল, "না, জান। সময় পাইনি।"
"কেন? এক্ষুনি খাবে।এত কাজ করে কি হবে যদি শরীর ঠিক না থাকে?"
"আচ্ছা জানটা। যাচ্ছি খেতে। তুমি বলো, কতদূর গুছিয়েছ?"
"একটু একটু করে গোছাচ্ছি। বুঝোই তো, বাড়িতে এত মানুষ৷ সবার চোখ ফাঁকি দেয়া কি সহজ? কাল আরেকটু হলে স্বর্ণ আপু ধরেই ফেলেছিল। কোন রকমে বেঁচেছি।"
"বুঝি আমি। তবুও তো নিতে হবে। গহনাগুলো আমাদের বিয়েতে লাগবে। জানোই তো আমার মা নেই। তোমার মায়ের গহনা আমাদের পরবর্তী জীবনে তার দোয়ার মতো কাজ করবে। সেসব এমনিতেও তোমারই হতো। সেজন্যই এত বলছি।"
"জানি আমি। সব হয়ে যাবে। চিন্তা করো না।"
"আচ্ছা। রাখি তাহলে।"
"হুম। আই লাভ ইউ।"
"লাভ ইউ টু জান।"
অনিক কল কেটে দিয়ে মোবাইলের ওয়ালপেপারে মৌনির ছবিতে চুমু খেল। তারপর খাওয়ার জন্য বাইরে বের হলো।
দরজা খোলার সাথে সাথেই দেখতে পেল তাদের ঘিঞ্চি গলিতে একটা কালো মার্সিডিজ এসে দাড়িয়েছে। গাড়িটা দেখে অনিকের দাঁত বত্রিশ পাটি বের হয়ে গেল। গাড়ির সামনে গিয়ে বলল, "একদম ঠিক সময়ে এসেছ বন্ধু।"
গাড়ির ড্রাইভিং সিটের কাচ নেমে গেল। ওপাশে একজোড়া অপূর্ব সুন্দর গাঢ় কালো চোখ চকচক করতে দেখা গেল।
চলবে.....................................................
লেখা- Sumaiya Aman Nitu

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ