­

নুরী

নুরীর বয়স পাঁচ বছর সাতমাস। তার কোনো কাজ নেই। সকাল থেকে সে এখান থেকে সেখানে, সেখান থেকে এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার ঘুরে বেড়ানোর জায়গাও অল্প, বাড়ির তিনদিকে পানি। বাবা সকালে ঘুম থেকে উঠেই নৌকা নিয়ে বের হয়ে গেছে কচুরিপানা নিয়ে আসতে। সেগুলা বাড়ির চারপাশে ছড়িয়ে দেবে ঢেউ ঠেকাতে।
নুরী বারান্দায় এলো। একটা পিঁপড়া ওর পায়ে কামড়াচ্ছে। পা ঝাড়তে ঝাড়তে বারান্দার বাইরে উঠানে গেলো নুরী। সেখানে সাদাকালো একটা ছাগল বাঁধা। এটা তাদের ছাগল। ছাগলটার বাচ্চা হয়েছে পাঁচ ছয়দিন আগে। দুইটা মেয়ে বাচ্চা, একটা ছেলে বাচ্চা। বাচ্চাগুলার গাঁয়ের রঙও সাদাকালো।
একটা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে উঠানের মাটিতেই বসে পরলো নুরী। মাথায় হাত বুলাতে লাগলো। বাকী বাচ্চাগুলা নুরীর দিকে তাকিয়ে রইলো। যেন তারাও কোলে উঠতে চায়। নুরী ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো,"এই তোরাও কোলে উঠবি নাকি?" বাচ্চাগুলা কোনো জবাব দিলোনা। যেভাবে ছিলো সেভাবেই তাকিয়ে রইলো। নুরী একটু পর তিনটা বাচ্চাকেই কোলে তুলে নিলো। তিনটা বাচ্চার জায়গা তার কোলে হয়না। একটা বাচ্চা তার কোলের বাইরে চলে গেলো। তবুও সেটাকে জড়িয়ে রাখলো নুরী। যেন কোলেই আছে।
মা কোথায়? খিদে পেয়েছে নুরীর। শরীরে ধুলাবালি নিয়েই ঘরে ঢুকলো ও। মা আমেনা বেগম রান্নাঘরে রান্না করছে। মাটির চুলা। আগুনের চেয়ে ধোঁয়া বেশি বের হচ্ছে। ওনি কাশছেন। নুরীরও কাশি পেলো। মায়ের একেবারে পাশে যেতে গিয়ে কাটা পেঁয়াজ মরিচের প্লেটটা উল্টিয়ে ফেললো নুরী। কী হয়েছে বোঝার আগেই তার হাত লেগে পাশের পানিভর্তি জগটাও উল্টে গেলো। মাটির মেঝেতে মরিচ, পেঁয়াজ, আর পানিতে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো। আমেনা বেগম সেদিকে একবার তাকিয়ে নুরীর পিঠে এক চাপড় বসিয়ে দিলেন। নুরী ভ্যা করে কেঁদে ফেললো।
নুরী ভাত খাবেনা। মা কিছুক্ষণ আগেই মেরেছেন। এখন সাধছেন ভাত খাওয়ার জন্য। নুরী গাল ফুলিয়ে বসে আছে। আমেনা বেগম নুরীকে এসে কোলে নিলেন। ওনার হাতে মাখানো ভাতের প্লেট। দুই টুকরা কৈ মাছ। তিন টুকরা আলু। ভাতের লোকমা নুরীর মুখের সামনে রেখে বললেন, "খাইয়া ল মা, আর কখনও এমন হইবোনা।" নুরী হা করে খেতে শুরু করলো।
"মা, বাবা এহনও আইতাছেনা ক্যান?" ঘাড় তুলে মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো নুরী। ওর মুখভর্তি ভাত। কথা আটকে যাচ্ছে। আমেনা বেগম ভাতের আরেকটা লোকমা ঠিক করতে করতে বললেন, "চলে আসবো। তুই তাড়াতাড়ি খাইয়া নে। ইস্কুলের টাইম হই গেছে।"
স্কুলে নতুন ভর্তি হয়েছে নুরী। খুব আগ্রহ করে প্রতিদিনই স্কুলে যায়। ওদের স্কুলের আপামনিও খুব ভালো। প্রতিদিন সুন্দর সুন্দর গল্প বলেন।
.
.
নুরী স্কুলে যাচ্ছে। একা একাই যেতে পারে ও। স্কুল খুব বেশি দূরে নয়। কিন্তু রাস্তা ভালোনা। তাছাড়া রোজই বৃষ্টি হয়, তাই রাস্তার অবস্থা আরো খারাপ। ওর পা সহ জামাতেও কিছুটা কাদা লেগে গেলো স্কুলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে।
ক্লাস চলছে। নুরীর হঠাৎ বাবার কথা মনে পরলো। বাবাকে সে আজ স্কুলে আসার সময় দেখেনি। তার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। এমন সময় দেখলো ক্লাসের দরজায় তার বাবা গফুর উদ্দিন হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা তার জন্য অনেকগুলা একটাকা দামের চকলেট নিয়ে এসেছে। নুরী তার ক্লাসের সবাইকে চকলেটগুলা ভাগ করে দিলো। আপামনিকেও দিলো। তার বাবাকেও দিলো। গফুর উদ্দিন আপামনির সাথে ভালোমন্দ কথা বলে বিদায় নিলেন। নুরীর মন ভালো হয়ে গেলো।
.
.
"কই গো নুরীর বাপ, নুরী তো এহনও আইলোনা। ওর ইস্কুল তো অনেক আগেই ছুটি অয়। আপনে গিয়ে একটু দেইখা আসেননা।" সুঁইয়ের মধ্যে সুতা ভরতে ভরতে গফুরকে কথাগুলা বললেন আমেনা বেগম। ওনি কাঁথা সেলাই করতে বসেছেন। গফুর উদ্দিন পাতার বিড়ি ফুঁকছিলেন। বউয়ের তাড়া শুনে বিড়ি ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। নুরীকে আনতে গেলেন স্কুল থেকে।
স্কুল অনেক আগেই ছুটি হয়ে গেছে। কেউ নেই স্কুলে। কিন্তু নুরী কোথায় গেলো? কারো সঙ্গে খেলতে চলে গেলোনা তো? কিন্তু নুরী এমন না। ও স্কুল ছুটি হওয়ার সাথেসাথে সোজা বাড়িতে যায়। গফুর উদ্দিন আশপাশটা খুঁজে দেখলেন। হঠাৎ নুরীর শ্লেটটা পরে থাকতে দেখলেন রাস্তায়। গফুর উদ্দিন চিন্তিত হয়ে উঠলেন। কোথায় গেলো নুরী? শ্লেটটা হাতে নিলেন গফুর উদ্দিন। সামনে একটা ছোটোখাটো জঙ্গলের মত জায়গা। গফুর উদ্দিন সেই জঙ্গলে ঢুকে মেয়ের নাম ধরে ডাকতে লাগলেন। কোনো জবাব নেই। এগুতে এগুতে তিনি জঙ্গলের ভেতরেই একটা পুকুরের কাছে পৌঁছলেন। নুরীকে পরে থাকতে দেখলেন পুকুরের পাড়ে। তার সারা শরীর রক্তাক্ত।
.
.
ডাক্তার বাড়ির সামনে একটা ছোটোখাটো জটলা হয়ে গেলো। আমেনা বেগমকে দেখে মনে হচ্ছে সত্তর বছরের বৃদ্ধা মহিলা। অথচ ওনার বয়স মাত্র ছাব্বিশ। চীৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ওনি দিশেহারা হয়ে গেছেন। গফুর উদ্দিন বাইরে বসে আছেন। মনে মনে দোয়া করছেন ওনি যা চিন্তা করছেন সেটা যেন কোনোভাবে সত্যি না হয়।
নুরীর ক্লাসমেট সুফিয়া এসেছে ডাক্তারবাড়িতে। গফুর উদ্দিন ত্রস্তভাবে সুফিয়াকে জিজ্ঞের করলেন, "আমার নুরীর কী হইছেরে মা? ওরে কে মারছে?" সুফিয়া জবাব দিলো, "চাচা ওরে তো কেউ মারেনাই। আমরা যখন ইস্কুল থাইকা ফিরতাছিলাম, তখন চেয়ারম্যান চাচার যে বড় পোলাডা আছেনা, যে হাইস্কুলে পড়ায়, ওনি আইসা আমাদের কইলো ওনি নাকি সুন্দর একটা খেলা জানেন। কইলো আমরা যদি ওনার সাথে খেলি তাইলে ওনি আমাদের অনেক চকলেট দিবেন। আমরা কইলাম আইচ্ছা খেলমু। ওনি তখন আমাদের ওই জঙ্গলে নিয়া গেলো খেলতে। তারপর নুরীর উপরে উঠে কী জানি খেললো। নুরী তখন চিল্লাইতেছিলো। আমি ওনারে কইলাম, এইটা কেমন খেলা নুরী তো ব্যথা পাইতাছে। আপনে ওরে ছাড়েন, আমরা খেলমুনা আর। ওনি ছাড়লেন না। আমি তখন ভয় পাইয়া দৌঁড়াইয়া চইলা আইছি। "
গফুর উদ্দিন বিকট একটা শব্দ করে একটু দূরে সরে গেলেন। আমেনা বেগম কোনো কথা বলতে পারেননি। সুফিয়ার কথা শোনামাত্রই মূর্ছা গিয়েছেন। সুফিয়ার মা সুফিয়াকে জোর করে টানতে টানতে টানতে নিয়ে চলে গেলো। উপস্থিত কয়জন মহিলা আমেনা বেগমের দাঁতের ফাঁকে পয়সা ঢুকিয়ে ওনার মূর্ছা ভাঙানোর চেষ্টা করছে। আমেনা বেগমের মূর্ছা ভাঙতেই ওনি উদভ্রান্তের মত চীৎকার শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পর আবার মূর্ছা গেলেন ওনি।
.
.
গফুর উদ্দিন সুফিয়াদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সুফিয়ার মা সোজাসোজি জানালেন সুফিয়া কিছুই দেখেনি। ও ভুল করে কথাগুলা বলে ফেলেছে। গফুর উদ্দিন হাতজোড় করে বললেন, "ভাবী! এমন কইরেননা ভাবী। আপনার মাইয়ার কথার উপর অনেককিছু নির্ভর করতাছে। " সুফিয়ার মা গফুরকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন। সুফিয়ার বাবা আসলেন তখন। এসে গফুরের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "দেখো গফুর! যা হইছে ভুইলা যাও। মামলা টামলা কিছু করতে যাইওনা। চেয়ারম্যান তোমারে জানে মাইরা দিবো। সেইসাথে আমাদেরও। "
.
.
গ্রামের ডাক্তার জানালেন নুরীর চিকিৎসা তার পক্ষে করা সম্ভব নয়। যত দ্রুত সম্ভব গফুর যেন তার মেয়েকে শহরের হাসপাতালে নিয়ে যায়।
আজ প্রায় পাঁচদিন হলো নুরীকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করেছেন গফুর উদ্দিন। আমেনা বেগম হাসপাতালের বারান্দা থেকে নড়ছেন না। ওনাকে দেখে বোঝার উপায় নেই ওনার বয়স ছাব্বিশ। শরীর হাড্ডিসার হয়ে গেছে এই কয়দিনেই। কিন্তু নুরীর অবস্থার কোনো উন্নতি নেই। ওর মুখে সারাক্ষণ অক্সিজেন মাস্ক লাগানো থাকে। নুরী কিছুক্ষণ পরপরই হৃদয়বিদারক চীৎকার করে উঠে। আর সহ্য করতে পারেননা আমেনা বেগম। হাসপাতালের ওয়াশরুমে গিয়ে ওজু করে আসেন। তারপর দুই রাকাত নফল নামাজ পড়েন। নামাজ শেষে দুহাত তুলে দোয়া করেন, "হে আল্লাহ! আমার মাইয়াডারে তুমি সুস্থ কইরা দাও আল্লাহ। আর নাইলে তুমি ওরে নিয়া যাও। আমি আর সহ্য করবার পারতাছি না। আমার ফুলের মত মাইয়াডারে এতো কষ্ট দিওনা আল্লাহ। ওয় তো কোনো পাপ করেনাই।"
আল্লাহ আমেনা বেগমের দোয়া কবুল করেছেন। ওনি চেয়েছিলেন যাতে নুরী হয় সুস্থ হয়ে যাক, নয়তো ওকে আল্লাহ নিয়ে যাক। আল্লাহ দ্বিতীয় দোয়াটি কবুল করেছেন। সাতদিনের দিন নুরীর চীৎকার চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন।
.
.
ইমাম সাহেব বাংলায় জানাজার নামাজের নিয়ত বলে দিচ্ছেন। "চার তাক্ববীরে জানাজার নামাজ। ফরজে কেফায়া..........."
খাটিয়াটা বেশ বড়। এটা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। নুরীর বয়সী কেউ মারা যাবে এই ধারণা হয়তো যারা খাটিয়া বানায়, তারা করেনি। নুরীকে এই খাটিয়ায় ভীষণ বেমানান লাগছে। গফুর উদ্দিন কাফনটা একটু সরিয়ে তার মেয়ের দিকে তাকালেন। কী সুন্দর মুখশ্রী তার মেয়ের। ওনার মনে হলো নুরী ঘুমিয়ে আছে। ওনি তার হাতটা একটু নুরীর গালে ছোঁয়ালেন। অন্য সময় ওর গালে
হাত দিলে গাল লাল হয়ে যেতো। আজ আর হলোনা।
জানাজার নামাজ শেষ। ইমাম সাহেব দোয়া পড়তে শুরু করলেন। অপ্রাপ্তবয়স্কদের জানাজার নামাজের দোয়া আলাদা। "আল্লাহুম্মাজ আলহা লানা ফারতাও ওয়াজ আলহা লানা আজরাও ওয়া যুখরাও ওয়াজ আলহা লানা শাফিয়াও ওয়া মুশাফ ফায়ান।"
আমেনা বেগমের কান্নায় বাতাস স্থবির হয়ে আছে। গফুর উদ্দিনের কাঁধে তার মেয়ে নুরীর খাটিয়া। ওনি জীবনে বহু ভারী বোঝা অবলীলাক্রমে বহন করেছেন। আজকের বোঝাটা খুব বেশি ভারী মনে হচ্ছে। টাল সামলে রাখতে পারছেন না ওনি।
.
.
এক সপ্তাহ পর। চেয়ারম্যান সাহেব তার সেক্রেটারি কে নিয়ে গফুর উদ্দিন এবং আমেনা বেগমের সামনে বসে আছেন। কিছুক্ষণ পর বলতে শুরু করলেন, "গফুর দেখো, যা হওয়ার হইছে। চিল্লাপাল্লা কইরা লাভ নাই। আমার পোলাডার বউ ভাগি গেছে। ওর মাথা ঠিক নেই। তাই একটা ভুল করে বসছে। তোমারে ক্ষতিপূরণ হিসেবে আমি একলাখ টাকা দিতেছি। টাকাটা রাইখা দাও।" চেয়ারম্যান সেক্রেটারির দিকে ইশারা করলেন। সেক্রেটারি টাকার ব্যগটা বের করে সামনে রাখলো। চেয়ারম্যান সাহেব আবার বললেন, "টাকাটা গুইণা নেও গফুর। পুরা একলাখ আছে। আমি এহন যাই। আজকে মসজিদের মাঠে বিচার আছে একটা। জব্বারের পোলাডারে আজ লোকজন এক বিয়াইত্যা মাইয়ার লগে এক বিছানায় পাইছে। আমারেই তো এসবের বিচার করতে অয়।" বলে চেয়ারম্যান বেরিয়ে গেলেন। গফুর উদ্দিন আর আমেনা বেগম শ্যূণ্যদৃষ্টিতে তাদের মেয়ের রক্তমাখা টাকাগুলার দিকে তাকিয়ে রইলেন!
লেখা-সুমন্ত হাসনাইন
অনুমতি এবং কার্টেসি ছাড়া কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
কার্টেসি :চিনি বউ আর পিঁপড়া বরের গল্প

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ