নিশীথে_স্বপনে_জোছনায় (পর্ব-১)

নিশীথে_স্বপনে_জোছনায়
পর্ব-১
সপ্তমবারের মতো রিং হতে হতে কলটা কেটে গেলে বিরক্ত হয়ে মোবাইল বিছানার ওপর ছুড়ে মারলো প্রাচী। অসহ্য লাগছে তার। গায়ের প্রতিটা লোম রাগে খাড়া হয়ে আছে। চোখদুটো জ্বলে যাচ্ছে। সে কিছু সময় নিয়ে স্থির হলো। বড় করে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে আবার ফোন করল অর্নবকে। এবার অর্নব ফোন ধরেলো। 

"কী ব্যাপার? এতবার ফোন করছ কেন? জানো না আমি ব্যস্ত আছি?"

"কী নিয়ে ব্যস্ত? সারাদিন এত কিসের কাজ তোমার?

অর্নব হাসলো। "কতোই তো কাজ৷ কোনটা রেখে কোনটা বলব। সকালে ফটোশ্যুটের জন্য বসুন্ধরা গিয়েছিলাম। বিকেলে শ্যামলী। এক মুভি ডিরেক্টরের সাথে কথা বলতে৷ এখনও কাজ করছি। তোমাকে এই মুহূর্তে একেবারেই সময় দিতে পারব না। সরি।"

"এই কথাটা আমি গত চার মাস ধরেই শুনছি।"

"কী করব বলো...আমার ক্যারিয়ারের দিকটা তো দেখতে হবে।"

"হ্যাঁ তা তো হবেই! যদিও তোমাকে এক সপ্তাহ আগে বলে রেখেছিলাম আজ আমার সাথে শপিং এ যেতে।"

"ওহ...সরি সুইটহার্ট! আমার মাথা থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। কাল সময় করে নিয়ে যাব, প্রমিস।"

প্রাচী এবার শব্দ করে হেসে বলল, "তার দরকার নেই অর্নব। আমি শপিং করে ফেলেছি। বসুন্ধরা ফুডকোর্টে তোমাকে দেখেও এসেছি। নতুন মডেল মেয়েটা ছিল না? সুজানা? যার গা ঘেঁষে বসে কফি খাচ্ছিলে? রেস্টুরেন্টের কোণার টেবিলে বসে বসে বুঝি তোমাদের ফটোশ্যুট হয়? তা ক্যামেরাম্যান কোথায় ছিল?"

অর্নব একটু চুপ করে থেকে এবার চেঁচিয়ে বলল, "তুমি বুঝবে না এসব। সস্তা মনমানসিকতা তোমার। ফিল্মের জগতে এসব বিষয়ই না। কয়েকদিন পর আমি যখন ক্যামেরার সামনে নায়িকা কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াব, সবার সামনে রোমান্স করব, তখন কী করবে? এরচেয়ে ভালো তুমি আমাকে ছেড়ে দাও। নিজের মতো কাউকে খুঁজে বের করো।"

"তুমি তো সুযোগ খুঁজছিলে ব্রেকাপের কথাটা বলার। বলেই ফেললে!"

"তোমার তাই মনে হলে তাই।"

ফোন কেটে দিল অর্নব। প্রাচীর চোখদুটো নিজের অজান্তে ঝাপসা হয়ে এল। সে ছুটে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়ালো। বন্ধ পাল্লাদুটো খুলে দিতেই বাতাসের ঝাপটা আর বৃষ্টির ছাট এসে লাগলো শরীরে। বাইরে কিছু দেখা যাচ্ছে না পরিষ্কারভাবে। শুধু কিছু বাড়ির জানালার লাল-হলুদ আলো জ্বলছে। কেন যেন ক্লান্তিতে চোখদুটো বুজে আসছে প্রাচীর। ইচ্ছে করছে এখানে দাঁড়িয়ে ভিজতে ভিজতে ঘুমিয়ে যেতে। প্রাচী অনেক কাঁদতে চেয়েও পারলো না। নিজের ওপর নিজেই অবাক হলো। একসময় সে ভাবতো অর্নবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হলে সে মরে যাবে! 

.
অর্নবের সাথে প্রাচীর সম্পর্ক প্রায় চার বছরের। প্রথমে তারা বন্ধুই ছিল। প্রেমিক-প্রেমিকা হয়েছে বছর দুই আগে। অর্নবকে ভীষণ ভালো লাগতো প্রাচীর৷ স্মার্ট আর দারুণ সুদর্শন ছেলেটা কী চমৎকার করে কথা বলতো! শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হতো৷ অর্নব আশেপাশে থাকলে আর কিছুই ভালো লাগতো না। মনে হতো সে সব রঙ শুষে নিয়ে বাকি পৃথিবীটা সাদাকালো করে দিয়েছে।

একটা সময় পার করেছে যখন তারা ছিল প্রাণের বন্ধু। সারারাত ফোনে কথা বলা, প্রতিদিন দেখা করা ছিল বাধ্যতামূলক। প্রাচী অবশ্য সবসময় একটু চুপচাপ ধরনের। অর্নবই সব কথা বলতো। প্রাচী মুগ্ধ হয়ে শুনে যেতো। 

একদিন অর্নব প্রপোজ করলো তাকে। প্রাচী এক বাক্যে রাজি। শুরু হলো প্রেমের জীবন। কত সন্ধ্যা হাতে হাত রেখে ঢাকার রাস্তায় হেঁটে বেড়িয়েছে! কত সকাল হয়েছে একে অপরের গলা শুনে। প্রাচীর মোবাইলের ওয়ালপেপারে ছিল অর্নবের ছবি। তার ঘুম ভেঙেছে ভালোবাসার মানুষটির মুখ দেখে। তখনো অর্নব ছিল খুবই সাধারন একটা ছেলে৷ শুধুই অর্নব।  

কিছুদিন আগে থেকে সে হয়েছে মডেল অর্নব। ছোট ছোট কাজ করে টিভির পর্দায় এসেছে। ভালো অভিনয় আর চেহারার চটকের কারনে দ্রুতই প্রসার বেড়েছে তার। ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সে। 

প্রাচী প্রথমদিকে উৎসাহ দিচ্ছিল অর্নবকে। তার ভালো লাগছিলো ভালোবাসার মানুষটার এই উন্নতি। কিন্তু আস্তে আস্তে অর্নব বদলে গেল। তাকে একেবারেই সময় দেয়া বন্ধ করে দিল। সপ্তাহে হয়তো তাদের এক বা দুই ঘন্টা কথা হয়। তাও ভালোবাসার কথা কিছু না। অর্নবের ক্যারিয়ারের কথা।

সুজানা নামক মেয়েটার সাথে একটা সম্পর্কের কানাঘুষা প্রাচী শুনছিলো কয়েকদিন ধরেই। আজ নিজের চোখে দেখে এসেছে৷ মিনি স্কার্ট আর টিশার্ট পরা উগ্র সাজের মেয়েটার পাশে বসে অর্নব নির্লজ্জের মতো হাসছিলো আর মেয়েটার নগ্ন পায়ে হাত বুলিয়ে যাচ্ছিলো! প্রাচীর ইচ্ছে করছিলো টেবিলে রাখা সিরামিকের ফুলদানিটা নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে অর্নবের মাথাটা ফাটিয়ে দিতে৷ কিন্তু পারেনি। সামনেও যায়নি। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে বাড়ি ফিরেছে।

চেয়েছিল বোঝাপড়া করবে অর্নবের সাথে। তাও পারেনি৷ নিজের ওপর বিরক্ত লাগছে একটা ধোঁকাবাজ, চরিত্রহীন ছেলের পেছনে এতটা সময় নষ্ট করেছে বলে। কষ্টের চেয়ে বেশি রাগ লাগছে তার। এর আগেও অর্নবের নামে অনেক কিছু শুনেছে সে। কোনেটাই কখনো বিশ্বাস করেনি। উল্টো অর্নবের কথা শুনে সাবধান করে দেয়া লোকগুলোকে কথা শুনিয়েছে। তার ইউনিভার্সিটির সবচেয়ে ভালো বান্ধবীর সাথে ঝগড়া করে কথা বলা বন্ধ করেছে শুধু এই ছেলের জন্য। আজ সেসব মনে করে প্রাচীর ইচ্ছে করছে নিজের গালে নিজেই চড় মারতে।

এখন একটাই কাজ। অর্নবকে শিক্ষা দিতে হবে। সে এমনি এমনি ছেড়ে দেবে না কিছুতেই। সমানে সমানে হিসেব মেলানো হবে। কিছু না বললে এই বাড়াবাড়ি কোথায় গিয়ে ঠেকাবে এই ছেলে কে জানে! কথাটা মনে হতেই সবার আগে মনে পড়ল স্নিগ্ধার কথা। স্নিগ্ধা টম বয় ধরনের মেয়ে। ঠোঁটকাটা স্বভাব আর ছেলেদের মতো চলনের কারনে তাকে তেমন কেউ পছন্দ না করলেও প্রাচীর কাছে সে খুবই প্রিয় বান্ধবী৷ অর্নবকে শায়েস্তা করতে হলে স্নিগ্ধাকে লাগবেই। ওকে একটা ফোন করা যাক। 

স্নিগ্ধা ল্যাপটপে মুভি দেখছিলো। বিখ্যাত কিছু সিনেমা ডাউনলোড করেছে সে। কিন্তু ভালো লাগছে না কোনোটা। বিরক্ত হয়ে সে একটার পর একটা বদলে যাচ্ছে৷ প্রাচীর কল দেখে খুশি হলো সে৷ 

"কী ম্যাডাম! এতদিন পর মনে পড়ল আমায়?"

"হুম। তোর সাথে জরুরি কথা আছে।"

"কী হয়েছে রে? মন খারাপ তোর? গলা শুকনো কেন?"

"অর্নবের সাথে ব্রেকাপ হয়েছে।"

স্নিগ্ধা অবাক হয়ে বলল, "রাম সীতার জোড়ি ব্রেকাপ? কীভাবে সম্ভব? কী হয়েছিল রে?"

"ও চিট করেছে আমাকে। সুজানার সাথে রিলেশনশিপে গেছে।"

"ওইযে ঢঙ্গী সুজানা? ন্যাকা ন্যাকা কথা বলে যে? ওর যে কোনো সাক্ষাৎকার দেখলে আমার রাগে গা জ্বলতে থাকে।"

প্রাচী রাগত স্বরে বলল, "হ্যাঁ ওইটাই। এখন আমি অর্নবকে শিক্ষা দিতে চাই। কী করব বলে দে। আমার মাথায় কিছু আসছে না।"

"তোর কিছু করতে হবে না। সুজানার ঢং দেখতে থাকলে ও কয়েকদিন পর এমনিতেই সাইজ হয়ে যাবে।" হেসে বলল স্নিগ্ধা। 

"তুই হাসছিস? আমার এত কষ্টের মধ্যে..."

"আচ্ছা কাঁদিস না। আমি তোর বাসায় যাব কাল বিকেলে। তখন কথা হবে। এখন রিলাক্স হ। একটা ফ্রডের জন্য কান্নাকাটির দরকার নেই। ওয়েদার কী ভালো দ্যাখ! কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়।"

"আচ্ছা।"

"রাখছি। ভালো থাক।"

স্নিগ্ধার কথাটা বেশ মনে ধরলো প্রাচীর৷ সে ইয়ারফোন কানে দিয়ে উঁচু লয়ের একটা হিন্দি গান চালু করে শুয়ে পড়ল। অর্নবের কথা মনেও করলো না। কিন্তু বুকের ভেতর কিসের যেন শূন্যতা একেবারে জাঁকিয়ে বসেছে। কষ্ট উথলে উঠছে। প্রাচীর চোখ দিয়ে আপনাআপনি পানি গড়িয়ে পড়ল। সে এক সময় গান থামিয়ে কাঁথায় মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো।

.
রাত সাড়ে বারোটায় চুপচুপে ভিজে অবস্থায় ড্রইংরুমে দাঁড়িয়ে আছে নিভৃত। ফ্লোর ভেসে যাচ্ছে জামা, ট্রাউজার আর চুল থেকে টপটপ করে পড়া পানিতে। অন্য সময় হলে তার মা চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করতেন। আজও চেঁচাচ্ছেন, তবে অন্য কারনে। 

নিভৃত এইমাত্র ছাদ থেকে নামলো। বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়েছিল। রাতে বৃষ্টি হলে সে কখনোই ভেজা বাদ দেয় না। রাত তিনটা বাজে উঠে চুপিচুপি ছাদে গিয়ে ভিজে আসার রেকর্ডও আছে। 

আজ নেমেই শুনেছে তার বোনের বাচ্চা হয়েছে। নির্দিষ্ট তারিখের দেড় মাস আগেই হয়ে গেছে। যদিও মা-বাচ্চা দুজনেই সুস্থ আছে, তবুও নিভৃতর মা কেঁদে ভাসাচ্ছেন। নিভৃত হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার বাবা শক্ত নার্ভের মানুষ। এই সময় দেখা যাচ্ছে তিনিও চুপ হয়ে বসে আছেন। এদিকে দুর্যোগের মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছানোর চিন্তায় নিভৃতর মা রোকসানা আরও বেশি করে চেঁচাচ্ছেন।

নিভৃতরও কেমন একটা লাগলো। পেটের মধ্যে সুরসুরির মতো। বোনটা তার পিঠাপিঠি। একটু বড় ছিল যা! কত মারামারি, ঝগড়া করেছে! সেই ছোট্ট আহ্লাদি, ছেলেমানুষ মেয়েটার বাচ্চা হয়েছে। ভাবতেই কেমন কেমন লাগে! 

সম্বিত ফিরে পেতেই সে দ্রুত ঘরে ঢুকে জামাকাপড় বদলে নিল। যানবাহন কিছু পাওয়া যাবে না এ সময়। পাশের বাড়িতে তার বন্ধুর দুটো গাড়ি আছে, যার মধ্যে একটা ভাড়ায় চলে। ড্রাইভার তাদের বাড়িতেই থাকে। সেটা জোগাড় করে ফেলল। ড্রাইভারকে ডেকে তুলে নিয়ে এল। রাত একটা পনেরোতে রওনা দিল সবাই। রোকসানা এখনো কাঁদছেন৷ চোখের পানির বাঁধ ভেঙে গেছে। শাড়ির পাতলা আঁচলের চাপে কিছুতেই থামছে না সেই স্রোত। 

.
হাসপাতালে ঢুকতেই নাদিম এসে জড়িয়ে ধরলো নিভৃতকে। নাদিমের শরীর কাঁপছে। নিভৃত তাকে শক্ত করে ধরে রাখলো। বলল, "কংগ্র্যাচুলেশনস ভাইয়া! বাবা হয়েছেন। এখন এত আবেগী হয়ে পড়লে চলে?"

নাদিম কাঁপা গলায় বলল, "নিজের হলে বুঝবে। আমার এখনো মেয়েকে কোলে সাহস হয়নি। মনে হচ্ছে নিলে হাত থেকে পড়ে যাবে। আমি কী করে দায়িত্ব নেব বলো তো।"

নিভৃত হেসে নাদিমের কাঁধে হাত দিয়ে বলল, "তুমি পারবে ম্যান। তুমি না পারলে কে পারবে? তোমার মতো বাবা পেয়ে তোমার মেয়ে ধন্য।"

"মেয়েটা কী সুন্দর হয়েছে দেখবে চলো।"

কেবিনের ভেতরে গিয়ে দেখতে পেল অনিতা শুয়ে আছে। মুখটা রক্তশূন্য লাগছে। তবে ঠোঁটে মৃদু হাসি। ক্লান্ত চোখ। নিভৃতর এত মায়া লাগলো! বোনের বিয়ের পর থেকে সে একটু একটু করে বুঝতে পারছে বোনকে সে কতটা ভালোবাসে। আজ মনে হচ্ছে বোনটার জন্য তার অজস্র মায়া জমে আছে, যা কখনো প্রকাশ করা হবে না। 

অনিতা নিভৃতকে দেখে বলল, "যা বাবুকে কোলে নে।"

"তুই ভালো আছিস আপু?"

"হ্যাঁ।"

"ঘুম আসলে ঘুমিয়ে পড়।"

"দ্যাখ না বাবুকে আমার কোলে দেয়নি এখনো। ওরা কাড়াকাড়ি করছে।" অভিমানী সুর অনিতার গলায়। 

নিভৃত হেসে মায়ের কাছে গেল। বাবু এখন রোকসানার কোলে শোভা পাচ্ছে। রোকসানার চোখে এখনো পানি চিকচিক করছে। নিভৃত এক প্রকার জোর করে বাবুকে কোলে নিল। নাদিমকেও ডেকে আনলো বাইরে থেকে। বাবুকে অনিতার কোলের কাছে শুইয়ে দিয়ে বলল, "দেখ আপু, তোর মেয়েটা একদম স্নো হোয়াইটের মতো হয়েছে। কালো লম্বা চুল, লাল টুকটুকে ঠোঁট আর সাদা তুলোর মতো শরীর।"

"এই তুই নজর লাগাচ্ছিস কেন?"

নিভৃত হেসে সরে গেল। বলল, "চলে যাচ্ছি। বাকি সবাইকে নিয়ে যাচ্ছি। তোমরা মা বাবা বাচ্চা থাকো।"

নিভৃত তার মা বাবা আর নাদিমের মাকে নিয়ে বাইরে চলে এল। বাইরে বের হতেই চেয়ারে বসা স্নিগ্ধাকে দেখতে পেল সে। নিভৃতকে দেখে মৃদু হাসলো স্নিগ্ধা। নিভৃতর মনে হলো মেয়েটা বিষন্ন; সবসময় মনের মধ্যে একগাদা কষ্ট লুকিয়ে রাখে। খেয়াল করে চোখের দিকে না তাকালে সেটা টের পাওয়া যায় না। 
(চলবে)