সুখ পাখির দল (পর্ব_৩)

স্বর্ণর সুস্থ হতে পনোরো দিন লেগেছে। এখনো কপালে আর হাতে ব্যান্ডেজ আছে। হাসপাতাল থেকে তিনদিন পর রিলিজ দিয়েছে। মামারা তাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছে। মা মারা যাওয়ার পর থেকে স্বর্ন তার নানার বাড়িতে থাকে। এখানেই তার ছোট থেকে বড় হওয়া। স্বর্ণর দুই মামীই খুব ভালো। ছোটবেলা থেকে মায়ের অভাব বুঝতে দেয়নি। যতটা সম্ভব আগলে রেখেছে। এক্সিডেন্টের পর দুজনে পালা করে রাত জেগে স্বর্ণর দেখাশুনা করেছে।

বৃহস্পতিবার এই বাড়িতে ভাইবোনদের আড্ডার দিন। স্বর্ণর বড় মামার দুই ছেলে আবীর, সুমন, এক মেয়ে মোহনা। ছোট মামার এক ছেলে আরহান, দুই মেয়ে কেয়া, মৌনি। ওরা জড়ো হয়েছে মেয়েদের ঘরে। সব বোনেরা মিলে এক ঘরে থাকে, ভাইয়েরা সবাই আরেক ঘরে। আড্ডায় আরহান আর মৌনি বাদে সবাই উপস্থিত।
মোহনা গালে হাত দিয়ে বলল, "দিন দিন তোরা সব বোরিং হয়ে যাচ্ছিস। আগে ছুটির দিনগুলো কতো মজা হতো। এখন কী হয়? নাক ডেকে ঘুম!"
কেয়া হেসে বলল, "আর সবচেয়ে বেশি ঘুমাস তুই।"
মোহনা মুখ বাঁকালো।
সুমন বলল, "আসলেই লাইফটা সাবান পানির মতো হয়ে গেছে।"
সবাই হেসে উঠল। সুমন সবার মধ্যে বয়সে ছোট। এবার ক্লাস নাইনে উঠেছে।
আবীর বই পড়ছিল। বইটা বন্ধ করে বলল, "আমাদের আসলেই কিছু করা উচিত। সামথিং থ্রিলিং! স্বর্ণ, তুই কিছু বল। তোর মাথায় সবচেয়ে ভালো আইডিয়া আসে।"
স্বর্ণ চশমাটা নাক থেকে চোখের দিকে ঠেলে দিয়ে বলল, "থ্রিলিং বলতে ঠিক কেমন? কোথাও বেড়াতে যাব?"
"না না, তোর এমনিতেই এক্সিডেন্ট হলো। এখন কোথাও যাওয়া লাগবে না৷ বাসায় যা করা যায় তাই করব।"
সুমন বলল, "চলো পিকনিক করি। খিচুড়ি দিয়ে মাংস।"
"তোর খিচুড়ি খেয়ে শখ মিটবে কবে?"
সুমন মন খারাপ করে বলল, "তাহলে বারবিকিউ পার্টি করি।"
"দাদু করাবে ভালো করে..."
"তাহলে কী করবা করো.."
স্বর্ণ এক মিনিট ভেবেই তুড়ি বাজিয়ে বলল, "একটা আইডিয়া আছে। পুরানো আইডিয়া, কিন্তু মজার।"
"বলে ফেল।"
"চলো প্ল্যানচেট করি। আত্মাদের ডেকে আনি।"
কেয়া ভুরু কুঁচকে বলল, "ধুর! এসব শুধু শুধু সময় নষ্ট। কিচ্ছু আসে না।"
"তুমি করেছ কোনোদিন?"
"নাহ। কিন্তু কেউ প্ল্যানচেট করে ভূত নামিয়েছে এমন কথাও শুনিনি।"
"কিন্তু..."
আবীর বলল, "থাম তোরা। আইডিয়া খারাপ না।"
"হ্যাঁ। বাড়িতেও থাকা হবে, মজাও করা হবে।"
"তোর মাথায় এই বুদ্ধি আসলো কোত্থেকে, স্বর্ণ?"
"প্রেতচর্চার উপর একটা বই পড়ছি। দারুণ বই! সেখানে প্ল্যানচেটের ব্যাপারে অনেক কিছু লেখা আছে।"
"কী প্ল্যানিং হচ্ছে এসব? তোরা মেয়েরা প্ল্যানচেট করতে পারবি নাকি? যে ভীতু একেকটা!" আরহান ঘরে ঢুকতে ঢুকতে কথাগুলো বলল। কাঁধের ব্যাগটা রেখে খাটে পা উঠিয়ে বসল।
মোহনা বলল, "ভাইয়া, তুই কি ভাবিস আমাদের নিয়ে? আইডিয়া কিন্তু স্বর্ণর। আমরা মেয়েরা ঠিকই পারব। উল্টো তোর ভয় লাগছে কি না সেটা বল।"
আরহান হাসল। কেয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, "তুই পারবি? তোকে তো দেখেই মনে হচ্ছে ভয় পাচ্ছিস।"
কেয়া রাজি ছিল না। কিন্তু এখন না করলে সবাই ভীতু ভাববে। তাই অনিচ্ছা সত্বেও বলল, "আমার এত ভয় ডর নেই৷ পারব।"
"গুড। আবার পরে কান্না টান্না করিস না। আর মৌনি কোথায়?"
স্বর্ণ বলল, "ঘর অন্ধকার করে বসে আছে। কী যেন হয়েছে। ডাক দিলাম। বলল ভালো লাগছে না৷"
"অসুস্থ নাকি?"
স্বর্ণ বলল, "নাহ। তবে দুদিন ধরেই কিছু একটা নিয়ে খুব টেনশনে আছে। কী হয়েছে বলছে না।"
আবীর বলল, "ও ঠিক হয়ে যাবে। কেউ বকা টকা দিয়েছে হয়তো। তাহলে ডিসিশন ফাইনাল। আজ রাতেই আমরা প্ল্যানচেট করছি।"
কেয়া বলল, "করব কোথায়? সবাই মিলে গোল হয়ে বসার মতো জায়গা কোনো ঘরেই নেই। নিচতলায় আছে। কিন্তু সেখানে তো সারারাত আলো জ্বালানো থাকে।"
স্বর্ণ বলল, "জায়গা আছে। ছাদে। সেখানে আরও ভালো হবে। খোলা জায়গায় আত্মা সহজে আসবে।"
"হুম। তা ঠিক। তাহলে ছাদেই হোক।"
সবাই রাজি হলো। কিন্তু সমস্যা একটাই। দাদু। রাতে যাতে কেউ ছাদে না যেতে পারে সেজন্য দাদু সন্ধ্যাবেলা ছাদে তালা দিয়ে রাখেন। সেই তালার চাবি থাকে দাদুর ঘরে। চাবি উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। দাদুর ঘুম পাতলা। রাতে ঘরে একটা বিড়াল ঢুকলেও তাঁর ঘুম ভেঙে যায়।
আরহান একটু ভেবে বলল, "একটা ব্যবস্থা অবশ্য করা যাবে। তোরা চিন্তা করিস না। দাদুর দিকটা আমি দেখছি।"
.
মৌনি জানালার ধারে বসে আছে। পূর্ণিমা আজ। বিরাট চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। পাশের একতলা বাড়ির টিনের চাল চিকচিক করছে। আঙিনায় ফোটা হাস্নাহেনা ফুলের মাতাল করা ঘ্রাণ আসছে। ওপাশের ঘর থেকে সবার হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে। মৌনি চোখ মুছল। এসব সে আর কখনো হয়তো পাবে না। বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলে তারপর সবাই কি মেনে নেবে?
মৌনি বালিশের নিচ থেকে মোবাইল বের করে অনিককে ফোন করল।
"হ্যালো জান.."
"অনিক, কখন আসবে তুমি?"
"আমি সব ঠিকঠাক করে নিয়েছি এদিকে। ঠিক বারোটায় তোমার বাড়ির নিচে পৌঁছাবো। তুমি বের হয়ে আসবে। ঠিক আছে?"
"হুম।"
"সব নিয়েছ তো ঠিকমতো?"
"হ্যাঁ।"
"আচ্ছা। সাবধানে থাকবে। কেউ যেন ধরে না ফেলে।"
"হুম।"
মোবাইলটা সাইলেন্ট করে টেবিলর ড্রয়ারে রেখে দিল মৌনি।
.
আরহান দুটো কম পাওয়ারের ঘুমের ঔষধ এনেছে। যার মধ্যে একটা দাদুর দুধের সাথে মিশিয়ে দেবে। দাদুর এমনিতে কোন অসুখ বিসুখ নেই, তাই এই ঔষধেই কাজ হবে। আর এর কোনো সাইড ইফেক্টও নেই। কাজটা করতে তার ভয় ভয় হচ্ছে। তবুও নিজেকে সে অয়ভ দিল এই বলে যে, এটাতে দাদুর কিছুই হবে না৷ শুধু ঘুমটা গভীর হবে।
মৌনিকে অনেক বলা হলেও সে তাদের সাথে আসেনি। এমনকি তারা কী করার প্ল্যান করছে সেটা পর্যন্ত শোনেনি। কেউ তাই আর ঘাঁটায়নি। এমনিতেই মেয়েটা মেজাজি। থাকুক একা একা।
.
মৌনি দাদুর ঘরে উঁকি দিল। দাদু ইজি চেয়ারো চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। হাতে তসবি। মৌনি পা টিপে টিপে দাদুর পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। আস্তে আস্তে দাদুর কপাল টিপে দিতে লাগল। দাদু মুচকি হেসে বললেন, "কিরে মৌনি, হঠাৎ দাদুর কথা মনে পড়ল?"
"এমনি দাদু। অনেকদিন তোমার সাথে গল্প করি না তাই।"
"তাই নাকি? তাহলে গল্প কর।"
মৌনি কী বলবে ভেবে না পেয়ে চুপ করে রইল। তার কান্না পাচ্ছে। দাদুর সাথে এই বুঝি শেষ স্বাভাবিক কথাবার্তা। দাদুই বললেন, "কিছু চাই তোর?"
"নাহ।"
"তাহলে নিশ্চয়ই কোন অঘটন ঘটিয়েছিস?"
"না দাদু, কিছু করিনি এখনো।"
"তার মানে করবি?"
মৌনি নিশ্চুপ। দাদু বললেন, "ভয়ঙ্কর কিছু করবি নাকি?"
"ভয়ঙ্কর কিছু করলে তুমি কি অনেক বেশি রাগ করবে?"
"সেটা কতটুকু ভয়ঙ্কর তার উপর নির্ভর করে। তারচেয়ে যা করবি সেটা না করলেই হয়।"
মৌনি এবার কেঁদেই ফেলল নিঃশব্দে। ভাগ্যিস দাদুর চোখ বন্ধ তাই দেখতে পাননি। সে যেটা করবে সেটা থেকে ফিরে আসার কোন উপায় নেই। অনিককে যে সত্যি খুব ভালোবেসে ফেলেছে। তাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না।
দাদু কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন। সেই মুহূর্তে মৌনির মা মুনীরা চৌধুরী ঘরে ঢুকলেন। তার হাতে দুধের গ্লাস। মৌনিকে দেখে বললেন, "তুই এখানে?"
দাদু বললেন, "কেন আসতে পারবে না নাকি?"
মুনীরা হেসে দুধের গ্লাসটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, "খেয়ে নিন বাবা।"
"টেবিলের উপর রেখে যাও।"
"পরে ঠান্ডা হয়ে যাবে..."
"হবে না। খেয়ে নেব।"
মুনীরা গ্লাস রেখে চলে গেলেন। দাদু মৌনিকে বললেন, "যা তো মোনি দুধটা খেয়ে নে। আমার একদম ইচ্ছে করছে না খেতে।"
মৌনি হাসল। এটা দাদু আর মৌনির সিক্রেট। মৌনি সবসময় দুধ খেতে পছন্দ করে। তাই সে সামনে থাকলে দাদু কখনোই দুধ খান না৷ ও'কে দিয়ে দেন। যদিও মৌনির জন্যও রাতে সবসময় দুধ বরাদ্দ থাকে।
মৌনি এক চুমুকে দুধটুকু খেয়ে নিল। তারপর দাদুর পায়ের কাছে গিয়ে বসল। দাদু মৌনির মাথায় হাত রেখে বললেন, "আমার মৌনি ভুল কিছু করতেই পারে না। সে খুব বুদ্ধি নিয়ে জন্মেছে। একদিন অনেক বড় হবে।"
মৌনি বলল, "দাদু সেই গল্পটা শোনাও না।"
দাদু হেসে গল্প শুরু করলেন। একটু পরেই দেখলেন মৌনি ঘুমে পড়ে যাচ্ছে। তিনি মৌনিকে ডেকে তুললেন। মৌনি ঘুম ঘুম চোখে তাকাল। দাদু বললেন,"যা শুয়ে পড়। আরেকদিন গল্প শোনাব।"
মৌনি টলতে টলতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
.
আরহান দাদুর ঘরের বাইরে বসে আছে। দাদুর ঘুমানোর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বার বার এপাশ ওপাশ করছেন। কি ঔষধ রে বাবা! কাজই করল না! আরহান অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে যখন চলে যাচ্ছিল তখন দাদু উঠে বাথরুমে গেলেন। আরহান এক দৌড়ে ঘরে গিয়ে চাবিটা নিয়ে এল। সব রেডিই ছিল। দাদু বাথরুম থেকে বের হওয়ার আগেই সবাই ছাদে পৌঁছে গেল।
জ্যেৎস্না রাত বলে সব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ওরা মোমবাতি জ্বালাল। কেয়া হাসতে হাসতে বলল, "তোদের মোমবাতির চেয়ে ঢের বেশি আলো চাঁদমামা দিচ্ছে।"
কেয়ার কথা গায়ে মাখল না কেউ। চারটা মোমবাতি জ্বালিয়ে চতুর্ভূজ বানাল। মাঝখানে রাখল একটা পয়সা। সবাই গোল হয়ে বসল। স্বর্ণ বলল, "আমরা কার আত্মাকে ডাকব সেটা আগে ঠিক করতে হবে।"
সবাই ভেবে বের করল তারা তাদের দাদীর আত্মাকে ডাকবে। দাদীকে আবীর, কেয়া ছোটবেলায় দেখেছে। বাকীরা দেখেনি। স্বর্ণ বলল, "যাকে ডাকব তার নাম ধরে ডাকা হবে। নানুমণির নাম আলতা বানু। তাই সেই নামেই ডাকতে হবে। আমি আগে ডাকব তারপর সেভাবে সবাই মিলে ডাকবে।"
রাত একটা বাজার সাথে সাথে সবাই রেডি হয়ে গেল। এক মিনিট চুপচাপ বসে রইল। যেই স্বর্ণ বলতে যাবে কিছু ওমনি জোরে বাতাস এসে দুটো মোমবাতি নিভে গেল। ধ্যান ভঙ্গ করে মোমবাতি জ্বালানো হল। আবারও সবাই হাতে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে বসল। স্বর্ণ বলতে লাগল, "হে আলতা বানু, আপনি যদি আশেপাশে থেকে থাকেন, তাহলে আমাদের দেখা দিন। হে আলতা বানু..."
স্বর্ণর কথা শুনে কেয়া খিলখিল করে হাসতে হাসতে শুয়েই পড়ল। আবার ধ্যান ভঙ্গ হলো। স্বর্ণ বিরক্ত হয়ে বলল, "উফ! হবে না এভাবে..."
এদিকে কেয়া হেসেই যাচ্ছে। একে একে সবাই হাসিতে যোগ দিল।
.
অনিক বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে একঘন্টা ধরে। মৌনিকে এর মধ্যে পঞ্চাশবার ফোন করে ফেলেছে। মৌনি ধরছে না। তাহলে কি ভয়ে মেয়েটা সিদ্ধান্ত বদলে ফেলল? কিন্তু সে তো ভয় পাওয়ার মেয়ে না। তাহলে? যে করেই হোক মৌনিকে নিয়ে আসতে হবে। একসাথে এতগুলো টাকা, গহনা আর হুরপরির মতো মেয়েটাকে সে কিছুতেই হাতছাড়া করেত পারবে না।
অনিক বাড়ির ভেতরে ঢুকবে ঠিক করল। সামনে দিয়ে ঢোকা সম্ভব না। দারোয়ান আছে। পেছনের পাঁচিল টপকে জামগাছে উঠতে হবে। জামগাছের ডাল বেয়ে ছাদে চলে যাবে। সেখান থেকে ঘরের ভেতর।
(চলবে)
লেখা- Sumaiya Aman Nitu